Page 61 ( mrittikawebmag ) ইহকাল, পরকাল, ও অপত্যস্নেহ - Pritha Shyam
তিতলি যেন এখানে এসে থেকেই বড্ড আনমনা। বাবার কাজ টা কেন যে এমন কে জানে? বারবার এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যাওয়া মানেই তো সব পুরোনো বন্ধুগুলোকে ফেলে চলে আসা। বেশ তো ছিল ওরা শহরে, কেন যে এই গ্রামে এলো! জানালার গরাদ ধরে দাঁড়িয়ে এইসব ভাবছিল বছর দশেকের মেয়েটা। আগে এতটাও মনখারাপ করত না ওর কিন্তু গতবছর ঠাম্মু মারা যাওয়ার পর থেকেই মনটা কেমন যেন হয়ে থাকে ওর। অবশ্য গ্রামটা বড্ড সুন্দর- জানালায় দাঁড়িয়ে বেশ সময় কাটে।
হঠাৎ দূরের ভাঙা মন্দিরটার কাছে চোখ আটকে যায় তিতলির। একি? চাতালে একটা বুড়ি মতো কেও বসে না? কিন্তু একা একা কার সাথে কথা বলছে লোকটা? একবার কি গিয়ে দেখবে? কিন্তু মা যদি বকে? না না বকবে কেন? এইতো সে যাবে আর আসবে। গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে দরজাটা খুলে এগিয়ে গেল সে ভাঙা মন্দিরের দিকে। বুড়ির পাশে বসে বলল- " ও ঠাম্মা, তুমি এখানে বসে একা একা কার সাথে কথা বলছো?”
- " তুমি কে গো খুকি? তোমাকে তো এখানে আগে দেখিনি?”
খুকি বলায় একটু রাগই হল তিতলির। তবুও বলল- " আমি তো এখানে থাকতাম না সবে এসেছি। ওইইই যে পালবাড়ি আছে ওখানে থাকি। "
- " তাই বুঝি? তা তোমার নাম কি?”
- " আমার নাম তিতলি। কৈ , তুমি বললেনা তো যে কেন তুমি একা একা কথা বলছিলে? "
- " বাহ্ , ভারী মিষ্টি নাম তো তোমার? আমার নাতনীটাও তোমার মত মিষ্টি ছিল জানো? নাম দিয়েছিলুম পাখি... ওকে ছুঁতে বড্ড মন চায়/ তোরই মত বয়স হবে তারও/"
- " সে কোথায় ঠাম্? আমার সাথে পরিচয় করিয়ে দেবে গো? আমার এখানে একটাও বন্ধু নেই জানো? খুব একা একা লাগে..মা ও সারাদিন কাজ করে, আমি কি করি বলতো?"
- " আহা সোনামুখী, পরিচয় করাতে পারলে বুঝি করতুম না? সে তো অনেক দূরে থাকে আমার থেকে, আর কাচে আসতেও চায়না, কত ডাকি,তবুও না/ তারচেয়ে বরং তুমি এস রোজ একানে, তোমাকেই নাহয় গপ্পো শোনাবো?"
- "সে নাহয় আমি এসে শোনাবে, এতক্ষন একা একা কার সাথে গল্প জুড়েছিলে শুনি?"
- "ওরে পাকাবুড়ি, গপ্পো নয় রে, দুষছিলাম নিজের কপালকে... এমন নেকোন নইলে কি আর ভরা সংসার ছেড়ে থাকতে হয়? আমার কথা থাক, এবার তুমি বললো দিকিনি, তোমার বাড়িতে কে কে আছে?"
- "আমার বাড়িতে তো আমি, মা, বাবা আর এইটুকু একটা ভাই... সে না হাটতে পারে, না কথা বলতে পারে...ছোট তো/"
- "কিন্তু এখন যে তোমায় যেতে হবে খুকি? অন্ধকার বাড়চে, বাড়ি না ঢুকলে কিন্তু মা বড্ড বকবে/"
- "হ্যা গো! তুমি ঠিক বলেছো তো? আজ তবে যাই?"
- "যাই বলতে নেই খুকি, বল আসি/ যাওয়ার আগে এই ঠাম্মা কে একটু আদর করে যাও/"
চট করে একবার জড়িয়ে ধরেই ঘরের দিকে পা বাড়ায় তিতলি, তারই মধ্যে কখন টের পায়, তার হাতে কি যেন গুঁজে দিলো সেই বুড়ি/ যেতে যেতে শুনতে পেল- "আমগুলো খেও দিদিভাই আমাদের গাছের, এই মন্দিরের পেছনের বাড়িটাই আমাদের/ ঝড় হলে এস, অনেক পাবে/
ঘরে ফিরে মনটা বড্ড ভালো হয়ে যায় তিতলির, ঠাকুমা কত্ত ভালো...সেই নিয়ে কতই না গল্প মায়ের কাছে/
ওই আম দিয়ে টকডাল হবে না চাটনি, সেই নিয়েও কত জল্পনা/ কিছুক্ষন পর তিতলির বাবা বিভাসবাবুও চলে এলেন...কিন্তু ঘরে ঢুকে মেয়ের মুখে বৃত্তান্ত শুনে খুশি হওয়ার বদলে কেমন যেন গম্ভীর হয়ে গেলেন/ ওই মুখ দেখে তিতলির সমস্ত আনন্দ যেন মাটি হয়ে গেল/
রাত্রে তিতলি শুয়ে পড়ার পর বিভাসবাবু মুখ খুললেন- "মেয়েটা ভয় পাক আমি চাইনি তাই তখন তোমাকে কিছু বলিনি/ জানিনা ও যা বলছে তা সত্যি কিনা, কিন্তু যদি সত্যি হয়, ওকে আর ওই ভাঙ্গামন্দিরের কাছে যেতে দিও না/ ও যার কথা বলছে সে ওই ভাঙ্গামোদিরের পেছনের বাড়ির মুকুজ্জেগিন্নি/ আজ এক সপ্তাহ হয়ে গেল তিনি গত হয়েছেন/ শেষ বয়সে ওনার ছেলে বউরা ওনাকে একঘরে করে রেখেছিলো- ওই যা হয় আর কি, সম্পত্তি লিখিয়ে নেওয়ার পর/ শেষ মুহূর্তে নাকি নাতনিকে একবার দেখতে চেয়েছিলেন- নাম পাখি/" তিতলির মা সব শুনে শিউরে উঠলেন- মনে মনে ঈশ্বর কে ধন্যবাদ দিলেন/
কিন্তু তিতলি তখন ঘুমোয়নি, চুপ করে শুনেছিলো সবকটা কথা... যে ঠাম্মিটার সাথে দেখা হল, সে তারা হয়ে গিয়েছে? কিন্তু তাহলে ওর ভয় লাগছেনা কেন? ও যা দেখেছে তাতো মিথ্যে নয়? ওই ঠাম্মা টার গায়ের গন্ধটা ঠিক যেন ওর নিজের ঠাম্মুর মত- আলতো করে চোখটা খুলেই জানালার বাইরে আবার সেই মুখ দেখতে পেল! শুধু এবার দেখলো সেই বুড়ির চোখের কোনটা যেন চিকচিক করছে- তিতলি পরিষ্কার শুনতে পেল বুড়ি ফিসফিস করছে- "নিজের পাখিটাকে দেখা দিতে গেসলাম রে খুকি, ভয় পেয়েচিলো, ওর গায়ের ওম টা না পেলে যে আমার মরেও মুক্তি হতনা/
তাই তোকেই জড়িয়ে ধরলুম রে, ভয় পাসনি, আমি কি তোর ক্ষেতি করতে পারি বল? চললুম রে খুকি ভালো থাকিস!"- আসতে আসতে মিলিয়ে যায় মুখটা/ ঘুমে ঢোলে পরে তিতলি/
ইহলোক পরলোকের দেওয়াল অপত্যস্নেহকে রুখতে পারেনা, তাই হয়তো ঠাম্মি হারানো তিতলিকে খুঁজে নিতে দেরি হয়না সদ্যপ্রয়াত মুকুজ্জেগিন্নির/


Comments
Post a Comment