Page 58 ( Mrittikawebmag ) রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, সত্যজিৎ রায়, গ্রাম বাংলা - মানস মুখোপাধ্যায়
শিশুবেলায় প্রথম আমাদের কচি মনের ক্যানভাসে গ্রাম বাংলার ছবি এঁকে দিয়েছেন আমাদের কবিগুরু । সহজপাঠ এর সেই সহজ সরল ভাষায় তিনি তুলে ধরেছেন বাংলা মায়ের রুপ । যত বড় হয়ে যাই না কেন আমরা কেউ ভুলি নি সেই ছড়া : "আমাদের ছোটনদী চলে বাঁকে বাঁকে" বা "কুমারপাড়ার গরুর গাড়ি" । শিশুমনে সহজেই প্রবেশ করার এই পথ খুব সহজ মনে হলেও এর পথ ছিল খুবই বন্ধুর । আরো অনেক ছোটবেলার স্মৃতিতে ছড়া কবিতা লেখা আছে সব উল্লেখ করা এখানে সম্ভব নয় । তিনি নিজেই লিখেছেন তাঁর জীবনস্মৃতি গ্রন্থে যে শিশুকালে বিশ্বপরিকৃতির সঙ্গে তাঁর খুব একটা সহজ ও নিবিড় যোগ ছিল না । শহুরে পরিবেশে চার দেয়ালের মধ্যে কেটেছে শৈশবের বেশিরভাগটাই । গ্রাম বাংলা গড়ার স্বপ্নকে বাস্তবে পরিনত করতে অনেক পরিশ্রম ও কাঠ খড় পোড়াতে হয়েছিল ।
তিনি প্রথম উপলব্ধি করেছিলেন গ্রামের প্রকৃত উন্নতি সাধন করতে হলে গ্রাম সমূহের উন্নতি ব্যতিরেকে হতে পারে না। গ্রাম্য জীবনের সঙ্গে সংস্পর্শ ও সম্পর্ক ব্যতিরেকে গ্রামসমূহের উন্নতি হতে পারে না । শুধু সংস্পর্শ ও সম্পর্ক থাকলেই হবে না । উন্নতির উপায় ও প্রণালী জানা চাই ; বিশেষ করে কৃষির উন্নতি । প্রয়োজন হল কৃষি বিজ্ঞানকে জানা । তাই তিনি তার পুত্র রথীন্দ্রনাথ কে বিদেশে পাঠিয়েছিলেন কৃষি বিদ্যা অধ্যয়নে । প্রয়োজন এক যোগে কাজ করা, কাজের বন্টনের মধ্যে জীবিকার সন্ধান, সমাজবদ্ধ জীবন, একে অপরের মধ্যে মিলেমিশে থাকা । এই চিন্তাভাবনার মধ্যে তিনি বুঝে ছিলেন প্রয়োজন উপযুক্ত শিক্ষা ব্যবস্থা, চিকিৎসা ব্যবস্থার। এর সঙ্গে প্রয়োজন ছিল গ্রাম্য সালিশি মাধ্যমে বিচার ব্যবস্থা । তাঁর এই প্রয়াসে সহযোগিতা করেছিলেন সন্তোষ মজুমদার, জামাতা নগেন্দ্রনাথ , কালীমোহন ঘোষ , আমেরিকাবাসী লিওয়ার্ড কে এল মহাস্ট ।
সেই সময় ছিল ব্রিটিশ শাসন ও বাংলার সুবিধাবাদী কিছু জমিদারের রাজত্ব । সবাই রবীন্দ্রনাথ কে ভালো চোখে দেখেছিলেন বলা যাবে না । স্বার্থে ঘা পড়বে আশঙ্কায় তারা প্রতিবাদে মুখর হয়েছিল কবিগুরুর চিন্তা ভাবনায় । সেই প্রতিবাদ কে তুচ্ছ করে অদম্য সাহসিকতার পরিচয় দিয়ে তিনি থেমে থাকেনি নি । আমাদের নিশ্চয় মনে আছে "দুই বিঘা জমি" র কথা । জমিদার কেড়ে নিতে বসেছিল এক দরিদ্র প্রজার । তিনি শুধু কবি নন তিনি একাধারে বিশ্ব বন্দিত লেখক, উপন্যাসিক , প্রবন্ধকার, গ্রন্থকার । অন্য দিকে সমাজ সংস্কারক হিসাবে কাজ করে গেছেন জীবনের বেশীভাগ সময়টুকু । তার কবিতায় গানে লেখায় তিনি তুলে ধরেছেন গ্রাম বাংলার কথা । তাঁর কলমের আঁচড়ে আঁচড়ে ফুটে উঠত গ্রাম্য সমাজ, নিপীড়ন, দারিদ্র পীড়িত মানুষ গুলোর করুন মুখ । তার বিশাল কর্মকান্ড ও রচনাবলী ( প্রকাশিত ও অপ্রকাশিত ) এক জনের পক্ষে গুলে খাওয়া কখনই সম্ভব নয় ।
তার ওই ছোট নদীর হাঁটু জলও আমি পেরোতে পারি নি । স্বীকার করে নিতে কোন বাধা নেই ।
তাঁর গ্রাম বাংলাকে তথা সেই সময় কার সমাজবিধিকে জানতে অবশই পড়তে হবে তাঁর
"পল্লীপ্রকৃতি" । এই গ্রন্থের অন্তর্গত "পল্লীসেবা" নিবন্ধটি অত্যন্ত উপযোগী ও উল্লেখযোগ্য । তিনি এই নিবন্ধে পল্লীর সার্বিক উন্নতি ,আর্থ সামাজিক অবস্থার উন্নতি, শিক্ষা , জীবিকা, কৃষি, পশুপালন ও সমাজকল্যাণমূলক কাজ প্রভৃতির সব দিক তুলে ধরছেন । তিনি শিশু ও নারী শিক্ষার পাশাপাশি বয়স্ক শিক্ষার কথাও ভেবেছিলেন । তাঁর লেখায় তা দেখতে পাওয়া যায় । কবিগুরু তার লেখার মধ্যে স্বীকার ও প্রকাশ করেছেন যে যদি তাঁকে তার পিতা খাজনা আদায় ও জমিদারি সামলাবার দ্বায়িত্ব যদি না দিযে তাঁকে শিলাইদহে না পাঠাতেন কবি কোনদিনই সেই সময়কার গ্রাম বাংলার সামাজিক অবস্থা ও মানুষের পরিস্থিতির কথা তথা গ্রাম বাংলাকে জানতে ও বুঝতে পারতেন না। পিতার নির্দেশেই তিনি আসেন শান্তিনিকেতনে তাঁর পিতার খরিদা সম্পত্তির দেখাশোনা ও ব্রহ্মবিদ্যালয় স্থাপনের উদ্দেশে । সকল বিষয়ের দিকে নজর রেখে তিনি শান্তিনিকেতনে প্রতিষ্ঠা করেন " বিশ্ব ভারতী ( ২৩ শে ডিসেম্বর ১৯২১) । তার অল্পদিন পরেই তিনি ৬ই ফেব্রুয়ারি ১৯২১ তারিখে সুরুল কুঠিতে স্থাপন করেন "পল্লী সংগঠন " ব সুরুল সমিতি । এটি শ্রীনিকেতন নামে পরিচিত হয় অনেক পরে । এই সুরুল কুঠিবাড়িটি কবিগুরুর পিতা মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর কিনেছিলেন সিনহা পরিবারে কাছ থেকে । এই সিনহা পরিবারের নামেই আজকের কলকাতার লর্ড সিনহা রোড । সুরুলের সমবায় সমিতির মাধ্যমে তিনি কৃষকদের ঋণদান ও অর্থ প্রদান করতেন কৃষি কার্যে ব্যবহারের জন্য । তাঁর নোবেল প্রাপ্তির অর্থ তিনি এই ব্যাঙ্কে দিয়েছিলেন গ্রামের কথা তথা গ্রামের সাধারণ মানুষের কথা ভেবে । কবিগুরুর সমবায় গ্রন্থটি আজকের জনপ্রতিনিধি দের অবশই পড়া উচিৎ বলে মনে করি । গ্রাম উন্নয়ন বলতে আমরা ঠিক কি বুঝি তা কিছুটা হলেও বুঝতে পারা যাবে। সহভাগী পদ্ধতিতে গ্রাম উন্নয়নের কথা তিনিই বলেন যে কথা কে মাথায় রেখেই বোধ হয় আজকের পঞ্চায়েত ব্যবস্থা কে নতুন করে ভাবতে সাহায্য করছে আজকের প্রজন্মকে ।
আবার ফিরে আসি ছোটবেলায় । গুপী গায়েন বাঘা বায়েন ও হীরক রাজার দেশে দেখেন নি এমন বাঙালি খুঁজে পাওয়া যাবে না ।
....আহা কি আনন্দ আকাশে বাতাসে...... এই গানে ভূতের রাজার দেওয়া বরে যে আনন্দ উপভোগ করছেন গুপী (তপেন চাটার্জ্জী) ও বাঘা (রবি ঘোষ) তার থেকেও বেশি আনন্দ উপভোগ করেছি আমরা সিনেমা হলে বসে । জমিদারের আদেশে গ্রাম ছাড়া হতে হয়েছিল গুপী বাঘা কে । চরিত্রগুলো কাল্পনিক হলেও তুলে ধরেছিল বাস্তব চিত্রকে । যা শিশু মনে আনন্দ দিলেও ভাবিয়ে তুলেছিল বাংলার যুবসমাজকে । বিশ্ব বিখ্যাত চিত্র পরিচালক সত্যজিৎ রায় মহাশয়ের সম্ভবতঃ প্রথম সিনেমা "পথের পাঁচালি" (১৯৫৫) উপন্যাসিক বিভূতিভূষণ বন্দোপাধ্যায়ের গল্প অবম্বনে তৈরি । তিনি তাঁর অসাধারন প্রতিভার প্রকাশ ঘটিয়েছিলেন ততকালীন বাংলার গ্রাম সমাজ , নিপীড়ন, অর্থনৈতিকতা অবস্থা, জীবনসংগ্রাম, দুখঃ, দৈনতা , মৃত্যু, দারিদ্র জর্জরিত বাংলার রূপ তুলে ধরেছেন বিশ্বের দরবারে । অনেক অন্তরায় ও সমালচনার মধ্যেও তিনি সফল হয়েছিলেন । তিনি সেই সময় অর্থের অভাবে ছবিটি সম্পূর্ণ করতে পারছিলেন না । তৎকালীন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী ডা: বিধানচন্দ্র রায় মহাশয় এই ছায়াছবিটি সম্পূর্ন করতে আর্থিক সাহায্যের ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন । এই ছবির অনবদ্য পটভূমিকায় গ্রাম বাংলাকে তিনি তুলে ধরেছিলেন দর্শকদের সামনে । অপু দুর্গার রেলগাড়ি দেখতে সেই দৌড় কাশ বনের মধ্যে দিয়ে নিশ্চয় সকলের মনে পড়ে । দরিদ্র ব্রাহ্মণ
হরিহরের ঘরের অভাব অনটন, সর্বজয়ার সংসার ও ননদ ইনদি ঠাকুরন কে কি ভোলা যায়। এই চলচিত্র বাংলার ঘরে এনে দেয় দেশ বিদেশের অসংখ্য পুরুস্কার ।
এই প্রসঙ্গে বলা দরকার রবীন্দ্রনাথের মতোও সত্যজিৎ রায়ের ঠিক সে ভাবে গ্রাম বাংলার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে পরিচয় ঘটে নি । তিনি অন্যান্য লেখক দের রচনার মধ্যে তাঁর অনবদ্য প্রতিভার বিকাশ ঘটিয়ে তাদের গল্প কে জীবন্ত করে তুলে ধরেছেন গ্রাম বাংলার রূপ ও সমাজ ব্যবস্থাকে । মুদির দোকানে অপুর পাঠশালায় শ্রুতিলিখন । তুলসী চক্রবর্তীর সেই পাঠ '.....এই সেই জলস্থান মধ্যবর্তী ...." মনে পড়ে কি ? তিনি গ্রাম্য জীবনের সরল সহজ মানুষ ও তাদের রীতিনীতি ও নিত্য দিনের কর্ম ধারাকে তুলে ধরেছেন তার ক্যামেরায় । একি সঙ্গে শহুরে জীবন ও তৎকালীন সমাজব্যবস্থার রূপরেখা তুলে ধরেছেন অপুর যৌবনকালে (অপুর সংসার) । "জলসাঘর " আরও একটা উল্লেখযোগ্য ছবি সেখানে তিনি বাংলার সামন্ত্রতান্ত্রিক জমিদারি প্রথাকে তুলে ধরেছেন ।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গল্প অবম্বনে তিনি ৩ টে ছবি ( তিন কন্যা, চারুলতা ও ঘরে বাইরে) করেছিলেন । যেগুলো তৎকালীন বাঙালি সমাজের বিশেষ দিক তুলে ধরেন দর্শকের দরবারে । দর্শকের আসনে বসে সত্যজিৎ রায় এর ছবি দেখার অভিজ্ঞতা যাদের আছে কেবল তারায় উপলব্ধি করতে পেরেছেন চোখের সামনে ফুটে ওঠা জীবন্ত ঘটনা । মনেই হতো না চিত্রগৃহে বসে ছায়াছবি দেখছি । তাঁর ক্যামেরায় বন্দি হয়েছে অনেক বিখ্যাত লেখকের লেখা গল্প উপন্যাস । তৈরী হয়েছে অতুলনীয় সৃষ্টি তাঁর ছায়াছবিতে । সব নাম ও ঘটনাবলী বলতে গেলে রাত ফুরোবে, শেষ হবে না বলা । কাবুলিওয়ালা, ডাক ঘর, অরণ্যের দিনরাত্রি , চার অধ্যায় ,পোস্ট মাস্টার, শেষের কবিতা, মুক্তি, তাসের দেশ , চোখের বালি, মহানগর, আরো অনেক । তিনি ভারতরত্ন ও পদ্মভূষণ সহ অনেক অনেক সম্মানে সন্মানিত হয়েছেন দেশে বিদেশে ।
শেষ করার আগে একটা ছবির নাম না বললে বর্তমান কুসংস্কার ও ভাইরাসময় জীবন টা অসম্পূর্ণ থেকে যাবে । ঠিক ধরেছেন -- 'গণশত্রু ' ----- অনবদ্য অভিনয় সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় এর । বাকি গল্পটা ----সমকালীন কুসংস্কারাচ্ছন্ন সমাজে বিষাক্ত চরণামৃত পানে বাধা দিতে গিয়ে এক ডাক্তারের কি অবস্থার সঙ্গে লড়াই করতে হয়েছিল তা সবার জানা ।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, সত্যজিৎ রায় এই দুই মহান ব্যাক্তিত্ব ও গ্রাম বাংলা নিয়ে কিছু লেখার চেষ্টা করেছি মাত্র । এত অল্প কথায় তা শেষ হয় না । আরও অনেক কথা যা এই স্বল্প দৈর্ঘ্যের লেখার মধ্যে কখনই সম্ভব নয় ।
(পাঠক পাঠিকা দের কাছে বিনীত নিবেদন যদি কিছু ভুল হয় বা বাদ থেকে যায় নিজগুণে ক্ষমা করে দেবেন ।)
- মানস মুখোপাধ্যায়
তথ্যসূত্র :
১। রবীন্দ্র রচনাবলী । রবীন্দ্রনাথের শান্তিনিকেতন, বিশ্বভারতী
২। রবীন্দ্রায়ণ (প্রথম খন্ড) শ্রী পুলিন বিহারী সেন ৩। প্রবাসী , শ্রাবণ ১৩৪৩
৪। সমষ্টি সংগঠন ও সম্প্রসারণ, রবীন্দ্রপ্রয়াসের দ্বিতীয় পর্যায় শ্রী উৎপল চক্রবর্তী , অবসরপ্রাপ্ত ডব্লিউ বি সি এস অফিসার, প: স: ।
৫। বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় প্রকাশিত সিনেমা সংক্রান্ত খবরাখবর ও রচনাবলী ।


Comments
Post a Comment