Page 52 ( mrittikawebmag ) আলেয়া.....দলছুট পাখি
উফ! এই এক হয়েছে! ঝড় হলেই মটমট করে গাছের ডাল ভাঙবে আর কারেন্টের তার ছিঁড়বে। নাও এবার দুরাত কুপির আলোতে কাটাও।
কুড়ি বছর আগে জিরাটে অনেক বড় বড় গাছ ছিল, সাথে অনেক বাঁশ বাগানও। পুকুর, ডোবা তো গুনেও শেষ করা যাবে না। তখন সিঙ্গেল রেললাইন, অনেকক্ষন পর পর ট্রেন।
কলকাতায় এক দর্জির কারখানায় কাজ করে ধনেশ্বর।
নামের সঙ্গে সংসারের অবস্থা মেলাতে গেলে একটু ভুল হবে। তবে মনে প্রানে, সাহসে, বুদ্ধিতে পুরোপুরি সে ধনেশ্বর। শনিবার রাতে জিরাটে ফেরে, রবিবার পরিবারের সাথে কাটিয়ে আবার সোমবার শহরে।
সেদিন রাত দশটা নাগাদ ট্রেন থেকে নেমেই দেখে চারিদিক অন্ধকার। স্টেশন মাস্টারের ঘরে টিমটিম করে জ্বলছে একটা এমার্জেন্সি আলো। মোটে চার পাঁচজন লোক ট্রেন থেকে নেমে যে যার বাড়ির পথে হাঁটা লাগিয়েছে। ঝড়টা থেমেছে বটে, কিন্তু দুচার ফোঁটা বৃষ্টি তখন পড়ছে। স্টেশনের গুমটির নীচে দাঁড়িয়ে একটা বিড়ি ধরায় ধনেশ্বর।
'বাবু একটান দিন না',খসখসে গলায় কথাটা শুনেই চমকে ওঠে ধনেশ্বর।
ময়লা, ছেঁড়া কম্বল জড়িয়ে গুমটির একপাশে শুয়ে থাকা লোকটার হাতে জ্বলন্ত বিড়িটা দিয়ে দেয় দুটান দিয়েই।
এবার বাড়ির পথে পা বাড়ায় সে। অন্ধকারে চোখ কিছুটা সয়ে এসেছে। তার উপর বড় রাস্তার পাশের কিছু বাড়িতে হ্যারিকেন কুপির আলোয় সোজা রাস্তাটা চলতে খুব একটা অসুবিধা হচ্ছিল না। পাড়ার মোড়ে ঢুকতেই একটু অসুবিধায় পড়লো সে। প্রায় সব বাড়িই অন্ধকার। পাড়া গাঁয়ে সন্ধ্যে নামার সাথে সাথেই রাত গভীর হয়ে যায় এমনিতেই, তার উপর আজ আবার যা ঝড় বৃষ্টি হয়ে গেল!
পাড়ার মোড় থেকে সোজা মিনিট সাতেক হেঁটে বাম দিকে ঘুরে মিনিট তিনেক হাঁটলেই বাড়ি। সোজা বরাবর একটা বাড়িতে আলো দেখা যাচ্ছে। ওটার দিকে চোখ রেখেই পা চালায় ধনেশ্বর। কিছুটা হাঁটার পরই বুঝতে পারে ওর পিছন পিছন কেউ চলতে শুরু করেছে। কয়েক পা এগিয়ে থমকে দাঁড়ায় সে। অন্ধকারের সুযোগে চোরটোর হতে পারে। নিজের কব্জির উপর বেশ আস্থা আছে তার। এক ঘুসিতে চোরের নাক ফাটানো কোনো ব্যাপার নয়। কিন্তু সে যেই দাঁড়িয়ে পড়ছে ওমনি পিছনের অনুসরণকারীও দাঁড়িয়ে পড়ছে।
কিছুক্ষণ পরে ব্যাপারটা বুঝতে পেরে নিজের মনেই হেসে ফেলে সে। বেলবটম প্যান্টের নিচটা ভিজে গেছে। হাঁটার সময় একটা পায়ের সাথে আর একটা পায়ের ঘষা লেগেই ওই আওয়াজটা হচ্ছিল। চোরটোর কিছু নয়।
পাড়ার কাঁচা রাস্তায় জায়গায় জায়গায় একটু জল জমেছে কাদাও হয়েছে। জল কাদা মাড়িয়ে, রাস্তার শেষ আলোটায় চোখ রেখে দ্রুত চলতে থাকে সে।
ইসসস, এত কাদা হয়েছে রাস্তায় যে হাঁটাই মুশকিল হয়ে যাচ্ছে। পুরো পায়ের পাতাটা কাদায় আটকে যেতেই একটু থেমে যায় ধনেশ্বর। কোনো রকমে পা টাকে টেনে তুলে পরের পা এগোতে গিয়ে চমকে ওঠে ধনেশ্বর।
ততক্ষণে সেই পা হাঁটু পর্যন্ত জল কাদায় গেঁথে গেছে।
একটুও এদিক ওদিক না নড়ে, দুদিকে হাত বাড়িয়ে বোঝার চেষ্টা করে কোথায় দাঁড়িয়ে আছে সে। ভিজে ভিজে কচু গাছ হাতে ঠেকে তার। এবার আর বুঝতে ভুল হয় না তার। আর এক পা এগোলেই কোমর পর্যন্ত জল কাদায় ডুবতে হবে। রাস্তার শেষ আলোটা এখন তার থেকে হাত কুড়ি দূরেই।
আর কোনো সন্দেহ নেই কানাওয়ালার পাল্লায় পড়েছে সে। পথিককে ভুল পথ দেখিয়ে ডোবার জল কাদায় ডুবিয়ে মারাই কানাওয়ালাদের কাজ।
চিৎকার করে কাউকে ডাকতে গিয়ে অনুভব করে গলার স্বর তার বুজে গেছে। এক হাঁটু কাদায় দাঁড়িয়ে জোরে জোরে নিঃশ্বাস নেয় সে। পকেটে হাত ঢুকিয়ে দেশলাইটা বের করে ফস করে জ্বালায় ধনেশ্বর। সঙ্গে সঙ্গে সামনের আলোটা উধাও। হাতে জ্বলন্ত দেশলাই কাঠিটা ধরে আস্তে আস্তে পিছিয়ে আসতে থাকে।
ডোবা থেকে রাস্তায় উঠে কিছুটা স্বস্তি পায়। এবার দেশলাইয়ের কাঠি একটার পর একটা জ্বালিয়ে সঠিক পথে এগোতে থাকে। দেখে, যাবার কথা ছিল সোজা, কখন যেন ডান দিকে বেঁকে পুরো জলার মধ্যে পড়েছে।
আজ সত্যিকারের প্রাণে বেঁচে গেছে সে। বাড়িতে ঢুকতেই তাকে দেখে স্ত্রী অবাক হয়ে যায়। সারা গায়ে জল কাদা মেখে এক অবস্থা!
খেতে বসে স্ত্রীকে জানায় সব ঘটনার কথা। রাতে আর ঘুমন্ত ছেলে মেয়ে দুটোকে ডেকে বলেনি কোনো কিছু। অবশ্য বলেছিল তাদের এই ঘটনার কথা। পরের দিন রবিবার বাজার যাবার সময় ইচ্ছে করেই একবার ওই ডোবাটার সামনে গিয়ে দাঁড়িয়েছিল ধনেশ্বর।
গত রাতেই তার অন্তিম গন্তব্য হতে চলেছিল এই পানা পুকুর।
সোমবার কলকাতায় ফিরেই দুটো ব্যাটারির টর্চ কেনে সে। একটা বাড়ির জন্য আর একটা নিজের জন্য।
এখন অবশ্য ওই পানাপুকুর আর নেই। জলা ভরাট করে বেশ বড় বাড়ি তৈরী হয়েছে। মাঝে মাঝে এখন জিরাট গেলে ওই জায়গাটার দিকে তাকিয়ে মনে পরে ছোটবেলায় বাবার মুখে কথাগুলো শুনে কেমন ভীষণ রকম ভয় পেয়েছিলাম।
কুড়ি বছর আগে জিরাটে অনেক বড় বড় গাছ ছিল, সাথে অনেক বাঁশ বাগানও। পুকুর, ডোবা তো গুনেও শেষ করা যাবে না। তখন সিঙ্গেল রেললাইন, অনেকক্ষন পর পর ট্রেন।
কলকাতায় এক দর্জির কারখানায় কাজ করে ধনেশ্বর।
নামের সঙ্গে সংসারের অবস্থা মেলাতে গেলে একটু ভুল হবে। তবে মনে প্রানে, সাহসে, বুদ্ধিতে পুরোপুরি সে ধনেশ্বর। শনিবার রাতে জিরাটে ফেরে, রবিবার পরিবারের সাথে কাটিয়ে আবার সোমবার শহরে।
সেদিন রাত দশটা নাগাদ ট্রেন থেকে নেমেই দেখে চারিদিক অন্ধকার। স্টেশন মাস্টারের ঘরে টিমটিম করে জ্বলছে একটা এমার্জেন্সি আলো। মোটে চার পাঁচজন লোক ট্রেন থেকে নেমে যে যার বাড়ির পথে হাঁটা লাগিয়েছে। ঝড়টা থেমেছে বটে, কিন্তু দুচার ফোঁটা বৃষ্টি তখন পড়ছে। স্টেশনের গুমটির নীচে দাঁড়িয়ে একটা বিড়ি ধরায় ধনেশ্বর।
'বাবু একটান দিন না',খসখসে গলায় কথাটা শুনেই চমকে ওঠে ধনেশ্বর।
ময়লা, ছেঁড়া কম্বল জড়িয়ে গুমটির একপাশে শুয়ে থাকা লোকটার হাতে জ্বলন্ত বিড়িটা দিয়ে দেয় দুটান দিয়েই।
এবার বাড়ির পথে পা বাড়ায় সে। অন্ধকারে চোখ কিছুটা সয়ে এসেছে। তার উপর বড় রাস্তার পাশের কিছু বাড়িতে হ্যারিকেন কুপির আলোয় সোজা রাস্তাটা চলতে খুব একটা অসুবিধা হচ্ছিল না। পাড়ার মোড়ে ঢুকতেই একটু অসুবিধায় পড়লো সে। প্রায় সব বাড়িই অন্ধকার। পাড়া গাঁয়ে সন্ধ্যে নামার সাথে সাথেই রাত গভীর হয়ে যায় এমনিতেই, তার উপর আজ আবার যা ঝড় বৃষ্টি হয়ে গেল!
পাড়ার মোড় থেকে সোজা মিনিট সাতেক হেঁটে বাম দিকে ঘুরে মিনিট তিনেক হাঁটলেই বাড়ি। সোজা বরাবর একটা বাড়িতে আলো দেখা যাচ্ছে। ওটার দিকে চোখ রেখেই পা চালায় ধনেশ্বর। কিছুটা হাঁটার পরই বুঝতে পারে ওর পিছন পিছন কেউ চলতে শুরু করেছে। কয়েক পা এগিয়ে থমকে দাঁড়ায় সে। অন্ধকারের সুযোগে চোরটোর হতে পারে। নিজের কব্জির উপর বেশ আস্থা আছে তার। এক ঘুসিতে চোরের নাক ফাটানো কোনো ব্যাপার নয়। কিন্তু সে যেই দাঁড়িয়ে পড়ছে ওমনি পিছনের অনুসরণকারীও দাঁড়িয়ে পড়ছে।
কিছুক্ষণ পরে ব্যাপারটা বুঝতে পেরে নিজের মনেই হেসে ফেলে সে। বেলবটম প্যান্টের নিচটা ভিজে গেছে। হাঁটার সময় একটা পায়ের সাথে আর একটা পায়ের ঘষা লেগেই ওই আওয়াজটা হচ্ছিল। চোরটোর কিছু নয়।
পাড়ার কাঁচা রাস্তায় জায়গায় জায়গায় একটু জল জমেছে কাদাও হয়েছে। জল কাদা মাড়িয়ে, রাস্তার শেষ আলোটায় চোখ রেখে দ্রুত চলতে থাকে সে।
ইসসস, এত কাদা হয়েছে রাস্তায় যে হাঁটাই মুশকিল হয়ে যাচ্ছে। পুরো পায়ের পাতাটা কাদায় আটকে যেতেই একটু থেমে যায় ধনেশ্বর। কোনো রকমে পা টাকে টেনে তুলে পরের পা এগোতে গিয়ে চমকে ওঠে ধনেশ্বর।
ততক্ষণে সেই পা হাঁটু পর্যন্ত জল কাদায় গেঁথে গেছে।
একটুও এদিক ওদিক না নড়ে, দুদিকে হাত বাড়িয়ে বোঝার চেষ্টা করে কোথায় দাঁড়িয়ে আছে সে। ভিজে ভিজে কচু গাছ হাতে ঠেকে তার। এবার আর বুঝতে ভুল হয় না তার। আর এক পা এগোলেই কোমর পর্যন্ত জল কাদায় ডুবতে হবে। রাস্তার শেষ আলোটা এখন তার থেকে হাত কুড়ি দূরেই।
আর কোনো সন্দেহ নেই কানাওয়ালার পাল্লায় পড়েছে সে। পথিককে ভুল পথ দেখিয়ে ডোবার জল কাদায় ডুবিয়ে মারাই কানাওয়ালাদের কাজ।
চিৎকার করে কাউকে ডাকতে গিয়ে অনুভব করে গলার স্বর তার বুজে গেছে। এক হাঁটু কাদায় দাঁড়িয়ে জোরে জোরে নিঃশ্বাস নেয় সে। পকেটে হাত ঢুকিয়ে দেশলাইটা বের করে ফস করে জ্বালায় ধনেশ্বর। সঙ্গে সঙ্গে সামনের আলোটা উধাও। হাতে জ্বলন্ত দেশলাই কাঠিটা ধরে আস্তে আস্তে পিছিয়ে আসতে থাকে।
ডোবা থেকে রাস্তায় উঠে কিছুটা স্বস্তি পায়। এবার দেশলাইয়ের কাঠি একটার পর একটা জ্বালিয়ে সঠিক পথে এগোতে থাকে। দেখে, যাবার কথা ছিল সোজা, কখন যেন ডান দিকে বেঁকে পুরো জলার মধ্যে পড়েছে।
আজ সত্যিকারের প্রাণে বেঁচে গেছে সে। বাড়িতে ঢুকতেই তাকে দেখে স্ত্রী অবাক হয়ে যায়। সারা গায়ে জল কাদা মেখে এক অবস্থা!
খেতে বসে স্ত্রীকে জানায় সব ঘটনার কথা। রাতে আর ঘুমন্ত ছেলে মেয়ে দুটোকে ডেকে বলেনি কোনো কিছু। অবশ্য বলেছিল তাদের এই ঘটনার কথা। পরের দিন রবিবার বাজার যাবার সময় ইচ্ছে করেই একবার ওই ডোবাটার সামনে গিয়ে দাঁড়িয়েছিল ধনেশ্বর।
গত রাতেই তার অন্তিম গন্তব্য হতে চলেছিল এই পানা পুকুর।
সোমবার কলকাতায় ফিরেই দুটো ব্যাটারির টর্চ কেনে সে। একটা বাড়ির জন্য আর একটা নিজের জন্য।
এখন অবশ্য ওই পানাপুকুর আর নেই। জলা ভরাট করে বেশ বড় বাড়ি তৈরী হয়েছে। মাঝে মাঝে এখন জিরাট গেলে ওই জায়গাটার দিকে তাকিয়ে মনে পরে ছোটবেলায় বাবার মুখে কথাগুলো শুনে কেমন ভীষণ রকম ভয় পেয়েছিলাম।


Comments
Post a Comment